October 24, 2026, 2:57 pm
শিরোনাম:
যশোরে এক্স টাইলস অ্যান্ড বাথওয়্যারের নতুন রিটেইল শোরুম উদ্বোধন COP31 সামনে রেখে নগর জলবায়ু সহনশীলতা ও ন্যায্য রূপান্তরে সমন্বিত উদ্যোগের আহ্বান বাংলাদেশে আলফা স্টোর চালু করেছে অনার দশজন তরুণ চেঞ্জমেকারকে সম্মানিত করলো জেসিআই বাংলাদেশ প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা সমাজেরই সম্পদ। তাদের জীবন মানউন্নয়নে সরকার কাজ করে যাচ্ছে -সমাজকল্যাণ মন্ত্রী বাংলাদেশ বেতার এর সাবেক আলোক চিত্র শিল্পী ফটো সাংবাদিক লুৎফর রহমানের ২০তম মৃত্যুবার্ষিকী দারাজের ১০.১০ শপিং ফেস্টে প্রি-পেমেন্ট ভাউচার, ব্র্যান্ড রাশ আওয়ার ও বিভিন্ন ক্যাটাগরিতে বড় ছাড় ফ্ল্যাশ সেলে সর্বোচ্চ ৮০ শতাংশ, হট ডিলে সর্বোচ্চ ৭৫ শতাংশ ছাড় এবং ৬৪ জেলায় নির্বাচিত পণ্যে ফ্রি ডেলিভারি বিশ্ব হার্ট দিবস ও পপুলার ক্যাথল্যাবের প্রথম বর্ষপূর্তি উদযাপন ঝংকার ললিতা কলা একাডেমীর ৫৯ তম প্রতিষ্ঠা বার্ষিকী উদযাপন ঝংকার ললিতা কলা একাডেমীর ৫৯ তম প্রতিষ্ঠা বার্ষিকী উদযাপন

গানেই বেঁচে থাকবেন গৌরী প্রসন্ন মজুমদার

Reporter Name

 

মোহাম্মদ তারেক

বাংলাদেশ বেতারের প্রখ্যাত আলোকচিত্রী লুৎফর রহমানের ক্যামেরার সামনে দেশ-বিদেশের অনেক নামকরা কন্ঠশিল্পী , গীতিকার, সুরকার, সিনেমার নায়ক – নায়িকা, অভিনেতা – অভিনেত্রী সহ বিশিষ্টজনেরা দাঁড়িয়েছিলেন। তাদেরকে তিনি ফিল্মে বন্দি করেছিলেন । আর তা করতে গিয়ে অনেকের সাথেই তার মধুর সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল । ‘তুমি যে আমার ওগো তুমি যে আমার ’ আমার স্বপ্নে দেখা রাজকন্যা থাকে সাত সমুদ্রর তের নদীর পাবে’-এই বিখ্যাত কালজয়ী গানের গীতিকার ছিলেন প্রয়াত কিংবদন্তি গৌরী প্রসন্ন মজুমদার । তাঁর অনেক বিখ্যাত গান রয়েছে। প্রেম-ভালোবাসা আর বিরহের কথা তাঁর গানে কতটা জীবন্ত হয়ে উঠে । তিনি খ্যাতিমান কবি আর গীতিকার। ক্যামেরার ফেরিওয়ালা লুৎফর রহমানের কাছে গৌরী প্রসন্ন মজুমদার ছিলেন একজন প্রকৃত বন্ধু, বড় ভাইয়ের মতো। তাঁর সান্নিধ্য লুৎফরকে অভিভূত করেছিল । একটা সময় গৌরী প্রসন্ন মজুমদার ভক্ত হয়ে যান তিনি । ১৯৭২ সালে গৌরী প্রসন্ন মজুমদারের সাথে লুৎফরের প্রথম দেখা হয়েছিল কলকাতায় । যুদ্ধ বিধ্বস্ত সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশ তখন ব্যস্ত নতুন করে সাজতে। সাংস্কৃতিক অঙ্গনও ব্যস্ত ছিল। নতুন অভিজ্ঞতা আর সাংস্কৃতিক বিনিময় করতে প্রথম যে প্রতিনিধি দল ভারতে গিয়েছিল, সেখানে গীতিকার ফজল-এ-খোদা, কন্ঠশিল্পী আব্দুল জব্বার এর মতো বিশিষ্টজনেরা ছিলেন। সেই দলে ছিলেন আলোকচিত্র শিল্পী লুৎফর রহমান। সেখানে যাবার দু’তিন দিন পর তাদেরকে দেখাশোনার জন্যে লম্বাকৃতির পাতলা ছিপছিপে এক ভদ্রলোক ছিলেন । তাঁর ইশারায় দেখভাল চলছে। সবাই তাকে গৌরীদা বলে ডাকছে।
এদেশের সাংস্কৃতিক প্রতিনিধিদল যে ক’দিন কলকাতায় ছিল, প্রায়ই তারা বালিগঞ্জের একটি বাসায় গান-বাজনা করতে বসতেন । সেই আসরে ছিলেন নীতা সেন, আব্দুল জব্বার, ফজল-এ-খোদা, শহিদুল ইসলাম আর চিত্রনায়ক অসিত বরণসহ অনেক নামী-দামী গুণীজন। সেখানে শুধু গান গাওয়াই হতো না, নতুন গানে সুরও দেয়া হতো। গানে নতুন সুর দেয়ার পর গৌরীদা বলতেন-কেমন হলো, কেমন লাগছে? গৌরীদা’র লেখা ‘একটি মুজিবরের কন্ঠে ধ্বনি প্রতিধ্বনি আকাশে বাতাসে ওঠে রনি’- জনপ্রিয় এ গানটি অংশুমান রায় গেয়েছিলেন । আলোচনা প্রসঙ্গে গৌরী প্রসন্ন একদিন বললেন , গানটি এতো হিট করবে জানলে হেমন্ত মুখোপাধ্যায় বা সলিল চৌধুরীকে দিয়ে গাওয়াতাম। এরই মাঝে একদিন লুৎফরকে দেখিয়ে ফজল-এ-খোদাকে জিজ্ঞেস করেন , এই ছেলেটি কে? উত্তরে ফজল-এ-খোদা জানালেন, কেন জানেন না, ওতো আমাদের বেতারের ফটোগ্রাফার লুৎফর। সেই থেকেই গৌরী প্রসন্ন মজুমদারের সাথে তার পরিচয় । তারপর থেকে দুজন একসাথে বিভিন্ন জায়গায় যেতেন। পরিচয় করিয়ে দিতেন বিভিন্ন লোকজনের সাথে। সদর রাস্তার চেয়ে অলিগলি দিয়ে চলতে বেশ স্বাছন্দ্যবোধ করতেন তিনি । পথে মহিলারা সবাই যেন গৌরীর মাসি-পিসি। খুব সুন্দর করে গৌরীদা তাদের ডাকতেন। তাদের সাথে লুৎফরকে পরিচয় করিয়ে দিয়ে বলতেন, ও না খুব ভালো ছবি তোলে-বাংলাদেশের ছেলে। প্রতিনিধি দল কলকাতায় থাকাকালীন গৌরীদা আব্দুল জব্বারকে দিয়ে একটি গান রেকর্ড করিয়েছিলেন। এছাড়াও তিনি সলিল চৌধুরী ও বিপুলকে দিয়ে গান রেকর্ড করান। রেকর্ডিং-এর ছবিগুলো লুৎফর রহমান তুলয়েছিলেন। আমি আমাকে দিয়ে তুলেছিলেন। সেই ছবিগুলো তুলে রেকর্ডিং স্টুডিওতে দিয়েছিলেন তিনি।
গৌরীদা প্রতিদিন সকালে এসেই সবার আড়ালে লুৎফরের পকেটে কিছু টাকা গুঁজে দিতেন। আর তাকে বলতেন-কলকাতা শহর, এখানে অনেক খরচ। কিন্তূ ওই টাকা খরচ করতে দিতেন না গৌরী প্রসন্ন। সারাক্ষণ তিনি লুৎফরের সাথে রাখতেন। যখন যা খরচ লাগতো তিনি তাই করতেন । সন্ধ্যা হলেই বালিগঞ্জের সেই বাসায় ফিরে গাওয়া, গান গাওয়া, নতুন গানের সুর দেয়ার মধ্যদিয়ে হাসি-তামাশা করা এভাবেই কেমন করে ১৫ দিন কেটে গেল বুঝতেই পারিনি লুৎফর । বিদায়ের ঘন্টা । বাংলাদেশে ফিরতে হবে তাদেরকে । বালিগঞ্জ থেকে গৌরীদা লুৎফরকে নিয়ে বাজারে যান । গৌরীদা লুৎফর কে জিজ্ঞেস করেন , তোর ছেলে-মেয়ে ক’টি? এক ছেলে দু’ মেয়ে। ওদের বয়স কত, গায়ের রং কেমন ইত্যাদিও জানলেন। তারপর লুৎফরের ছেলে-মেয়ের জন্যে দু’ সেট করে কাপড় কিনে দিলেন। সাথে তার স্ত্রীর জন্যেও কাপড় কিনে দিলেন। তারপর গম্ভীর হয়ে তিনি জিজ্ঞেস করলেন, মা বেঁচে আছেন? হ্যাঁ-সূচক উত্তর জানার পর তিনি চওড়া পাড়ের ধুতি, ভাল তেল ও বাবা জর্দা কিনে নিতে বললেন লুৎফরকে । পরদিন গাড়িতে উঠার আগে অনেকগুলো টাকা দিলেন তাকে । লুৎফর অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলেন । নিজে নিজে ভাবলেন ভদ্রলোক এভাবে তাকে কেন ঋণী করছেন? ঢাকায় আসার পর যে যার মতো কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়েন সবাই । মাঝে মধ্যে গৌরীদার কথা মনে হয়
লুৎফরের । কিছুদিন পর কণ্ঠশিল্পী রথীন্দ্রনাথ রায় গৌরীদাকে নিয়ে লুৎফরের মহাখালী ওয়ারলেস গেটের প্রতিচ্ছবি স্টুডিওতে এসে হাজির। গৌরীদা বুকে জড়িয়ে ধরলেন বন্ধু লুৎফরকে । তাকে বললেন, চল তোর বাসায় যাবো । গৌরী প্রসন্ন মজুমদার ভারতীয় সাংস্কৃতিক প্রতিনিধিদলের সাথে ঢাকায় আসেন । তাদের থাকার জায়গা ছিল হোটেল পূর্বানীতে। ঢাকায় এসেই খুঁজছিলেন লুৎফরকে। তিনি রথীনকে জিজ্ঞেস করলেন তোমাদের রেডিওর ক্যামেরাম্যানকে চেনো? সে জানালেন খুব ভালো চিনি। চেনার একটাই , সেটা হলো লুৎফর রথীন্দ্রনাথ রায়ের বিয়ের সব ছবি তুলেছিলেন। তারপর লুৎফরের সাদামাটা বাসায় চলে এলেন। তারপর তিনি লুৎফরকে বললেন, হোটেলে পুলিশী পাহারা একদম ভালো লাগে না তার। লুৎফর জানেন গৌরীদা কলকাতায় সবার বাড়িতে বাড়িতে যেতেন, কথা বলতেন । আর এখানে এমন বন্দি জীবন তাঁর ভালো লাগছিলনা। লুৎফুরের মাকে দেখে গৌরীদা বললেন, মা আমার কাছে বসেন। আপনার ছেলে খুব ভালো।
বিশেষ কোন আয়োজন নয়, সাদামাটা রান্না খেয়েই মনে হলো তিনি তৃপ্ত। অবশ্য রাতের খাবারের পর দই- মিষ্টিরও আয়োজন ছিল। তারপর বসলেন আড্ডায়। কথা প্রসঙ্গে লুৎফর বললেন জানেন দাদা, এবার ঈদে আমার কোন খরচ হয়নি। অবাক হয়ে গৌরীদা প্রশ্ন করলেন, কেন তোর কাছে বুঝি টাকা ছিল না? আমার কাছে একটা পোস্টকার্ড পাঠালেই তো হতো। ও বুঝেছি, আমাকে তোর আপন মনে হয় না। তারপর মাকে বললেন, মা আপনার ছেলে আমাকে পর ভাবে। মা বললেন, না বাবা। গৌরীদা বললেন, মা আমার বাড়ি এ দেশেই। এদেশের মানুষকে আমার খুব ভালো লাগে। লুৎফর বললেন, দাদা আপনি অযথাই রাগ করছেন, আমাকে ভুল বুঝছেন। আসল ঘটনা হচ্ছে , আপনি কলকাতায় আমার পরিবারের জন্য যে দুই সেট করে জামা-কাপড় কিনে দিয়েছিলেন, তার একসেট সবাই ব্যবহার করেছে আর একসেট তুলে রাখা হয়েছিল। তুলে রাখা সেট দিয়েই এবার ঈদ করেছি। লুৎফরের কথা শোনার পর গৌরীদা আবেগে কেঁদে ফেললেন। বাক রুদ্ধু কণ্ঠে বললেন, আমার দেয়া কাপড় পরে তোরা পুণ্যের কাজ করেছিস! লুথু! তুই আমাকে বড় ভাগ্যবান করে দিলি। তারপর তিনি চলে এলেন প্রতিচ্ছবি স্টুডিওতে। সেখানে গৌরীদা, রথীন বেশ কিছু ছবি তুলেছিলেন লুৎফরের ক্যামেরায় । ছবি তোলা, আড্ডা আর খাওয়া দাওয়া শেষ করে গৌরী প্রসন্ন মজুমদার কলকাতা ফিরে গেলেন। কলকাতা থেকে কেউ এলে লুৎফর গৌরীদার কথা জানতে চাইতেন । একবার কণ্ঠশিল্পী মাহমুদুন্নবী কলকাতায় যাবার আগে লুৎফরকে বললেন, লুথু-গৌরীদাকে একটা চিঠি লিখে দাও তো। আমি কলকাতায় গিয়ে তার সাথে দেখা করবো। লুথু উৎসাহ নিয়ে চিঠি লিখেছিলেন । পরে মাহমুদুন্নবী ফিরে এসে তাকে জানালেন, তোমার চিঠি পেয়ে গৌরীদা খুব খুশি হন । আমাকে খুব আদর করেছেন, সময় করে এলে আপনার মিষ্টি গলার গান রেকর্ড করবো।
মাহমুদুন্নবীর গান গৌরীদা রেকর্ড করতে পেরেছিলেন কি ? কিছুদিন পর জানা গেল গৌরী প্রসন্ন মজুমদার আর নেই। তিনি পাড়ি জমিয়েছেন পরপারে। কিন্তু গৌরী প্রসন্ন মজুমদার মরে গেলেও তার গানে বেঁচে থাকবেন যুগ যুগ ধরে মানুষের হৃদয়ের মনিকোঠায়।